শব্দমুকুরের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকার - অবন্তী সিঁথি
শব্দমুকুরের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে
অবন্তী সিঁথি
শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা বৈশাখ ১৪৩২-এ প্রকাশিত
কখনো শিস দিয়ে গান গেয়ে আবার কখনো গানের তালে তালে কাপ বাজিয়ে করেছেন বাজিমাত! তার গল্প শুরুই হয় ভিন্নভাবে! অবন্তী সিঁথি- এক নামেই যিনি আজ সংগীতপ্রেমীদের প্রিয়।
কখনও রিয়েলিটি শোর ঝলমলে আলোয়, কখনও দেশের কোনো
গানের আসরে অথবা ইউরোপীয় মঞ্চ, সব জায়গাতেই তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন তার সুরের জাদু। ইতোমধ্যেই
বেশ ক’টি গান পেয়েছে তুমুল শ্রোতাপ্রিয়তা। নানান বিষয় নিয়ে আলাপচারিতায় কথা হলো এই
নন্দিত কন্ঠশিল্পীর সাথে।
শব্দ মুকুর: শিস বাজিয়ে গান গাওয়ার ধারণাটা প্রথম কবে মাথায় এলো? প্রথমবার যখন কারও সামনে শিস দিয়ে গান গাইলেন, তখন তাদের অনুভূতি কেমন ছিলো?
অবন্তী সিঁথি: ধারণাটা ছোটবেলায়
পেয়েছিলাম। আমরা যখন স্কুলে যেতাম তখন স্কুলে যাওয়ার পথে বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ, গান,
শিসের সুর কানে ভেসে আসতো। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। বাসায় গিয়ে দিদিকে বলতাম,
“চল দেখি কে ভালো শিস দিয়ে আওয়াজ করতে পারে!” সেই থেকেই শুরু। একটি সময় দেখলাম শিস
দিয়ে সা রে গা মা বাজানো যায়। এরপর থেকেই আসলে শিস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুর বাজানোর
চেষ্টা থাকতো। প্রথম যে কার সামনে শিস বাজিয়ে ছিলাম সেভাবে বলতে পারবো না। তার অনুভূতি
কেমন ছিলো, সেটাও মনে নেই। তবে ছোটবেলা থেকেই আমি এ ব্যাপারে খুব অভ্যস্ত ছিলাম। বড়
হয়ে যখন রিয়েলিটি শো ক্লোজআপ ওয়ানের অডিশন
রাউন্ডে বাজালাম তখন সবাই খুব অবাক হয়েছিল। সাধারণত মেয়েরা এভাবে শিস বাজায় না, সেটা
তখন বুঝতে পেরেছি।
শব্দ মুকুর: বাংলাদেশ থেকে ভারত- সারেগামাপার মঞ্চে যখন প্রথম পারফর্ম করলেন, মনের মধ্যে তখন কী চলছিলো?
অবন্তী সিঁথি: সারেগামাপার মঞ্চে
আমি দুইবার পারফর্ম করেছি। দু'বারের অভিজ্ঞতাই আমার কাছে খুব বিশেষ। প্রথমবার পারফর্ম
করেছি ২০১৬ তে অতিথি শিল্পী হিসেবে। যদিও অতো বড় শিল্পী আমি নই, তবে তাদের মতো গুণী
মানুষদের সাথে এরকম বড় একটি মঞ্চে কাজ করতে পারাটা আমার জন্য অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিলো।
দ্বিতীয়বার আমি একেবারে ঠিকমতো অডিশন দিয়েই যাই। প্রথমবারের মতো গান শুনে তারা খুব
অবাক হয়েছিলো। আমার কাছে এটা জীবনের একটি বড় অর্জন। জাদুময় কিছু মুহূর্তের মধ্য দিয়ে
সময়গুলো কেটেছে আমার।
শব্দ মুকুর: ‘গা ছুঁয়ে বলো, ‘পাখি পাখি মন’ আর ‘রূপকথার জগতে’- এই তিনটি গানের মধ্যে কোনটার রেকর্ডিং এর সময় সবচেয়ে বেশি মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো? কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছিলো কি?
অবন্তী সিঁথি: তিনটা গানই আমার
জন্য ভীষণ স্পেশাল। প্রথমে শুরুটা হয়েছিলো ‘রূপকথার জগতে’ দিয়ে। এই গানটি আমি যখন
রেকর্ড করি তখন কঠিন লকডাউন চলছিলো। খুব বিষন্নতা চেপে বসছিলো। আমি গান ছেড়ে দেবো
বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এমন একটি অবস্থা। অনেক দিন হয়ে গেছে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে
না, বিশেষ করে মঞ্চ যাদের প্রাণ। সেই সময় একেবারে প্রাণহীন হয়ে গিয়েছিলো সব। একদিন
বিসিএস এর একটি বই পড়তে পড়তে যাচ্ছিলাম সাজিদ ভাইয়ের রেকর্ডিং স্টুডিওতে। সেখানে গিয়ে
ভাইয়াকে বললাম, আমি গান-টান ছেড়ে দেবো, বিসিএস পরীক্ষা দেবো। ভাইয়া অনেকক্ষণ শুনলেন।
শুনে বলেন, হুম... চলেন আমরা গানটি করি। গানটি আমি গাইলাম। সাধারণত যে কোনো গান আমি
খুব মনোযোগ দিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করি। যতোটা ভালো করা যায় ততোটুকুই করার জন্য সর্বোচ্চ
চেষ্টা করি। পরবর্তীতে এত মানুষ যে গানটি ভালোবাসবে, সেটা আমি কখনোই ভাবিনি। এরপরে
‘পাখি পাখি মন’, এ গানটি সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে আমি করেছি। কারণ ‘রূপকথার জগতে’র
পরে মানুষের প্রত্যাশা এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে আমার ভেতর দুশ্চিন্তা ভর করেছিলো। ভয়
পাচ্ছিলাম, কাজটা আমি ঠিকমতো করতে পারবো কিনা, শ্রোতাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না।
এই গানটি আমার গাইবার কথা ছিলো না। সেই জায়গা থেকেও আরও বেশি চাপে ছিলাম। গানটি একদিনে
না গেয়ে দুই দিনে আমাকে গাইতে হয়েছিলো। প্রথমবার গেয়ে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু একই সিনেমার
আরেকটা গান গাইতে গিয়ে বলেছিলাম যে এই গানটি আমি আবার গাইবো। এবারেও গান প্রকাশ হবার
পর মানুষ পছন্দ করে। একইসাথে ‘গা ছুঁয়ে বল’ এই গানটিও যে মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে, আমি
ভাবিনি। আমি খুব ভাগ্যবান যে এই তিনটা গানই মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে।
শব্দ মুকুর: আপনার লাইভ পারফরম্যান্সে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি, যা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়? কখনো কি ভুল করে অন্য গান গেয়ে ফেলেছেন? নাকি কোনো অদ্ভুত অনুরোধ পেয়েছেন?
অবন্তী সিঁথি: একেক ধরনের মঞ্চে
একেক রকম অভিজ্ঞতা হয়। হাসির কোনো অভিজ্ঞতা আমার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। প্রত্যেকটা
স্টেজেই বিভিন্ন ধরনের বিশেষ কিছু মুহূর্তের আবির্ভাব হয়। সেই মুহূর্তগুলো আমাকে খুব
আনন্দ দেয়। কিন্তু কোনো অদ্ভুত অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত হয়নি। তবে একটি বিষয় বলতে পারি।
আমি গানের কথা ভুলে যাই, এই ব্যাপারটা অহরহ ঘটে আমার সাথে। এমনও হয়েছে যে আমি ভুল লিরিকে
গান গাইছি কিন্তু দর্শকরা ঠিকঠাক গাইছে! মাঝে মাঝে বানিয়ে বানিয়েও গেয়ে ফেলি। এগুলো এখন আমার কাছে স্বাভাবিক ঘটনার মতোই হয়ে গেছে।
তাই গানের কথা ভুলে গেলে দর্শক শ্রোতাদের দিকে
মাইক বাড়িয়ে দেই, তখন তারাই আমার হয়ে গানটি গেয়ে দেয় (হাসি)।
শব্দ মুকুর: কোনো কফিশপে বসে
বই পড়ছেন, আর পাশের টেবিলে কেউ আপনাকে চিনতে পেরে গানের অনুরোধ করছে—এই পরিস্থিতিতে
পড়লে আপনি কী করবেন?
ক) হাসিমুখে গান
গাইবেন খ) রেগে যাবেন
গ) ‘চুপচাপ বই পড়তে দিন’ বলবেন (ঘ) উল্টো তাকে গান গাইতে বলবেন?
অবন্তী সিঁথি: সেভাবে কেউ চিনে
ফেললে আসলে গান গাইবার অনুরোধের থেকেও যেই অনুরোধ বেশি পাই, সেটা হচ্ছে সেলফি তোলার
অনুরোধ। কোথাও কেউ আমাকে চিনে ফেললে বলে না, আপু অমুক গানটি শোনান, বরং বলে আপু, আপনার
সাথে একটা সেলফি তুলতে পারি? (হাসি)
শব্দ মুকুর: গীতিকার ও সঙ্গীতশিল্পী কেতন শেখের সঙ্গে করা "সেই হৃদয়ের কাছে", "এনে দেবো মেঘ" এবং "কৃষ্ণপক্ষ"—এই তিনটি গানের মধ্যে কোন গানটি আপনার সবচেয়ে বেশি প্রিয়? কেন?
অবন্তী সিঁথি: কেতন ভাইয়ার সাথে করা তিনটা গানই আমার ভীষণ পছন্দের
গান। আসলে কোনো একটি গানকে বেছে নিতে বললে আমি সেভাবে বাছতে পারবো না। কারণ নিজের গাওয়া
প্রতিটি গানই আমার ভীষণ কাছের, খুব প্রিয়। তবুও যদি বলতেই হয়, তাহলে আমি দুটো গানের
কথা বলতে পারি। ‘এনে দেবো মেঘ’ এবং ‘কৃষ্ণপক্ষ’। একটি গানের কথা এবং আরেকটি গানের সুর
আমার পছন্দের।
শব্দ মুকুর: যদি আপনাকে বলা হয় বাকী জীবন আপনাকে শুধু ৩টি গান শুনে কাটাতে হবে। কোন ৩টি গান বেছে নেবেন?
অবন্তী সিঁথি: এটা পৃথিবীর সব থেকে
কঠিন প্রশ্ন আমার কাছে। ভেবে দেখতে হবে।
শব্দ মুকুর: আপনার যদি এমন কোনো সুপারপাওয়ার থাকতো যেখানে গানের মাধ্যমে মানুষকে নিরাময় করতে পারতেন, তাহলে কোন গান দিয়ে শুরু করতেন?
অবন্তী সিঁথি: আমার গান যদি শ্রোতাদের ভালো লাগে, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তবে গান গেয়ে কারো রোগ নিরাময় করার সুপারপাওয়ার থাকলে আমি তার পছন্দের গানই গাইতে চাইবো।
শব্দ মুকুর: পহেলা বৈশাখ বাঙালিদের জন্য শুধু একটি দিন নয়, এটা আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতীক। আপনি এই উৎসবে গান করেছেন। বাংলাদেশের বৈশাখী মঞ্চের সেই পরিবেশ, মানুষের উচ্ছ্বাস আর আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো? যদি বিশেষ কোনো মজার মুহূর্ত থাকে, সেটাও শুনতে চাই!
অবন্তী সিঁথি: সত্যি কথা বলতে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে মানুষের যে উচ্ছাস,
আনন্দ থাকো সেটা অনেক বছর হয়ে গেছে দেখি না। সর্বশেষ গেয়েছিলাম ২০১৯ কি '২০ সালের
বৈশাখে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান অনেকদিন করা হয়নি। তবে এ বছর আবার হবে, খুব হৈ চৈ
হবে বলে আশা করি। শিল্পী হিসেবে মঞ্চ থেকে যখন সবার উচ্ছ্বাস আনন্দ দেখি, তখন নিজের
মধ্যে একটি ভালো লাগা কাজ করে। সবার সাথে মিলে মুহূর্তগুলো বেশ উপভোগ করি। এটা আমাকে
খুব ভালো রাখে, আমার সময়গুলো আনন্দে কাটে।
শব্দ মুকুর: এখন আপনি ইংল্যান্ডে থাকেন, যেখানে প্রবাসী বাঙালিরা দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন করে থাকেন। সেখানকার শোগুলোতে আপনার গান গাইবার অভিজ্ঞতা কেমন? বিদেশের মাটিতে যখন বাঙালিরা আপনাকে ঘিরে একই উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে, তখন কি মনে হয়?
অবন্তী সিঁথি: এখানে বাঙ্গালীদের
আয়োজনে আমার কাজ করা হয়েছে। প্রবাসী বাঙালিরা আসলে দেশকে অনেক মিস করে। আমাদের সংস্কৃতি
ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য তারা যে সকল কাজ করে সেগুলো আমাকে মুগ্ধ করে। আসলে দূরে
থাকলে হয়তো শেকড়ের টান বেশি অনুভূত হয় যেটা আমি এখানে এসে দেখেছি। আমারও খুব ভালো
লাগে যে একটুকরো বাংলাদেশ পেয়ে যাই দেশের বাইরে।
অবন্তী সিঁথির সংগীতজীবন কোনো নির্দিষ্ট ফ্রেমে আঁকা যায় না। কখনও তা ছেলেবেলার প্রতিযোগিতার মতো মজার, কখনও আবার হঠাৎ গানের কথা ভুলে শ্রোতার মুখ থেকে ধার নেয়া পংক্তির মতো মিষ্টি এবং আপন। তিনি শুধু গান গাইছেন না, তিনি গান দিয়ে মুহূর্ত তৈরি করছেন। যা কখনও মঞ্চে, কখনও শ্রোতার হৃদয়ে আলো ফেলে। দেশ থেকে বিদেশ, শহর থেকে শহরতলী। যেখানেই থাকুন না কেন, অবন্তী সিঁথির মাঝে শ্রোতারা খুঁজে পান যেন নতুন দিনের সুর আর ভিন্ন প্রতিভার সুনন্দ অবস্থান। আর ঠিক সেখানেই অবন্তী হয়ে ওঠেন আমাদের মনের জানালায় ধরা এক শান্ত সংগীতের মূর্ছনা।
স্বত্ব - শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা ১৪৩২



.jpg)

Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.