তানজীনা ফেরদৌসের আইন পরামর্শ - দাদার আগে বাবার মৃত্যু : সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার আইন
তানজীনা ফেরদৌসের আইন পরামর্শ
আইন
ও অধিকার
দাদার আগে বাবার মৃত্যু : সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার আইন
শরিয়াহ আইন:
দাদার আগে বাবার
মৃত্যুতে নাতিদের প্রাপ্য উত্তরাধিকার বনাম প্রচলিত বাস্তবতা মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী
দাদার আগে বাবা মারা গেলে সন্তানরা কোনো অংশ পাওয়ার অধিকারী হন না।
মুসলিম ও পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ:
মুসলিম পারিবারিক
আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ সালের ৪ ধারা অনুসারে দাদা জীবিত থাকাবস্থায় বাবা মারা গেলেও মৃত
ব্যক্তির সন্তানরা দাদার মৃত্যুর পর দাদার সম্পত্তিতে অংশীদার হবে। সন্তানদের বাবা
জীবিত থাকাবস্থায় যেটুকু সম্পত্তি পেতেন, সমপরিমাণ সম্পত্তি সন্তানরা পাবেন। এ ক্ষেত্রে
ছেলে বা কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য হবে না।
ইসলাম ধর্ম যা বলে:
দাদার আগে বাবার
মৃত্যু হলে দাদার সম্পত্তিতে নাতি-নাতনিদের অংশ প্রাপ্তি, আমাদের প্রচলিত আইন এবং পবিত্র
কোরআনের সুরা নিসার ১৭৬নং আয়াত নিয়ে বেশ কিছু মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কোরআনের
মধ্যে ওয়ারিশদের প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অতঃপর সতর্ক করে দিয়েছেন যে,
এই বণ্টন অনুসরণ না করলে আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘনের ফলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: 'আল্লাহ তোমাদের অংশ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করলেন যেন তোমরা এ ব্যাপারে ভ্রষ্টতার শিকার না হও। আল্লাহ সব বিষয়ে অবগত।' (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৭৬)।
আমাদের নবী হযরত
মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, 'সমস্ত দরকারি জ্ঞানের অর্ধেকই হচ্ছে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত
জ্ঞান।'
উদাহরণ ১:
দাদার সম্পত্তিতে এতিমের অধিকারের বিষয়টি নিয়ে একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনাদের মাঝে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। জনাব আলী জীবিত থাকাবস্থায় তার ছেলে রহমত সাহেব মারা যায়। মৃত আলী সাহেবের একটি পুত্রসন্তান আছে। তার নাম মাসুম।
এখন দাদা আলী সাহেব মারা গেলে তার সম্পত্তিতে তার নাতি মাসুম মিয়ার কোনো অংশ বা ভাগ পাবে কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মাসুমের চাচারা তাকে তার দাদার সম্পত্তিতে প্রাপ্য পিতার অংশ থেকে বঞ্চিত করতে চাচ্ছে।
এ ঘটনার সমস্যা সমাধান
হিসেবে বলা যায় যে, যদিও মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী দাদার আগে বাবা মারা গেলে সন্তানরা
কোনো অংশ পাওয়ার অধিকারী হন না; কিন্তু মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ সালের ৪
ধারা অনুসারে দাদা জীবিত থাকাবস্থায় বাবা মারা গেলেও মৃত ব্যক্তির সন্তানরা দাদার মৃত্যুর
পর দাদার সম্পত্তিতে অংশীদার হবে। সন্তানদের বাবা জীবিত থাকাবস্থায় যেটুকু সম্পত্তি
পেতেন, সমপরিমাণ সম্পত্তি সন্তানরা পাবেন। এ ক্ষেত্রে ছেলে বা কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে
কোনো ধরনের বৈষম্য হবে না।
উদাহরণ ২:
আরেকটি উদাহরণ দিলে
আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। সেলিম সাহেবের ছয় ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের নাম রিমা। কিন্তু দুরারোগ্য
ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে রিমা তার একমাত্র কন্যাসন্তান মিম কে রেখে মারা যান। তার বেশ
কয়েক বছর পর মারা যান ছেলিম সাহেব। অর্থাৎ রিমা মারা যান ১৯৫৫ সালে এবং তার বাবা ছেলিম
সাহেব মারা যান ১৯৮৪ সালে।
কেস রেফারেন্স :
শেখ ইব্রাহীম ও অন্যান্য বনাম নাজমা বেগম, ৪৪ ডিএলআর (এডি), ২৭৬ পৃষ্ঠায়) এই মামলায় বলেছেন যে, 'মৃত ব্যক্তির কন্যাসন্তান ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার আগে না পরে মারা গেছেন, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সাকসেশন কবে ওপেন হয়েছে, সেটাই মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।'
সুতরাং, ছেলিম সাহেব মারা গেছেন ১৯৮৪ সালে; অর্থাৎ ১৯৬১ সালের আইন কার্যকর হওয়ার পরে এবং সাকসেশন ওপেন হয়েছে তার মৃত্যুর তারিখ থেকে। তাই মিম (তার নাতনি) অবশ্যই তার মা রিমা বেঁচে থাকলে যতটুকু সম্পত্তি পেতেন, সেই সমপরিমাণ সম্পত্তি তিনিও পাবেন।
ইসলামী আইন বনাম
'মুসলিম পারিবারিক আইন-১৯৬১ বিষয়ে আলোচনা করলে দেখা যায় যে, পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব
খান 'মুসলিম পারিবারিক আইন-১৯৬১'তে চালু করেছিলেন। এ আইনটির ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে
'যার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টিত হবে, তার পূর্বে তার কোনো পুত্র বা কন্যা
মারা গেলে এবং ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি বণ্টনের সময় ওই পুত্র বা কন্যার
কোনো সন্তানাদি থাকলে, তারা প্রতিনিধিত্বের হারে সম্পত্তির ওই অংশ পাবে- যা তাদের পিতা
অথবা মাতা জীবিত থাকলে পেত। শরীয়তের বিধান হলো দাদার জীবদ্দশায় পিতা মারা গেলে চাচাদের
উপস্থিতিতে নাতি নাতনিরা দাদার সম্পত্তি পাবে না।
যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে:
আমাদের সমাজে সাধারণত এরকম ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবার মৃত্যুর পর দাদা যদি বেঁচে থাকে এবং একটা সময় পর মৃত্যুবরণ করলে দাদার অন্যান্য ওয়ারেশরা যেমন ওই নাতি বা নাতনির চাচা বা ফুফুরা বলে থাকেন যে মৃত বাবার সন্তানাদি কোন সম্পত্তি পাবেন না।
যদি এমন ঝামেলা সৃষ্টি হয় তাহলে এক্ষেত্রে এতিম নাতি-নাতনি সংশ্লিষ্ট উপজেলার দেওয়ানী আদালতে বণ্টননামা মামলা দায়ের করতে পারেন। এবং সেই বন্টন মতে দাদার সম্পত্তিতে মৃত বাবা যা অংশীদার হতেন সেই একই অংশ মৃত বাবার সন্তানাদি ও প্রাপ্ত হবেন।
©তানজীনা ফেরদৌস
শব্দ মুকুর ই-পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যায় প্রকাশিত

Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.