নাঈমা অনামিকার কলাম - শিশুর বিকাশে উপযুক্ত গৃহ পরিবেশ
নাঈমা অনামিকার কলাম
অনামিকার
প্ল্যাটফর্ম
শিশুর বিকাশে উপযুক্ত গৃহ পরিবেশ
শুভেচ্ছা সবাইকে। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তুটা আবার একটু মনে করিয়ে দেই— ‘এই সময়ের বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের পরিপূর্ণ বিকাশে কীভাবে নিজেদের ভূমিকা রাখবে।‘ এই বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করেছি পূর্বের লেখায়। এক— ডিভাইস থেকে সন্তানকে দূরে রাখা, দুই— সন্তানের জন্য গুণগত সময় দেয়া। আলোচনার ধারাবাহিকতায় এবার যে বিষয়টি উপস্থাপন করতে চাই, সেটি হলো— ‘আবাসস্থল বা গৃহকে শিশুর উপযোগী এবং আরামদায়ক করে গড়ে তোলা।’
সারাদিনের
সময়টাকে হিসেব করলে আপনি লক্ষ্য করবেন- শিশুর সবচেয়ে বেশি সময় কাটে তার নিজ ঘরেই। তাই
ঘরটাকে শিশুর জন্য আকর্ষণীয় এবং বৈচিত্র্যময় করে গড়ে তোলা খুব জরুরি যেন ঘরে কাটনো
সময়গুলো তার জন্য আনন্দময় এবং গঠনমূলক হয়। শিশুর জন্য ঘরকে কীভাবে আকর্ষণীয় এবং উপযোগী
করে তৈরি করবেন, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শ এবং কৌশল আলোচনা করা যেতে পারে।
ছবি আঁকা ও রঙের জগৎ তৈরী করে দেয়া
প্রতিটি
শিশু আঁকতে পছন্দ করে, বিশেষ করে রঙের জগতে বিচরণ তাদের কাছে আনন্দময় অধ্যায়। তাই শিশু
একটু বড় হওয়া মাত্রই তাকে ছবি আঁকার উপকরণ কিনে দিন। তাকে ছবি আঁকায় উৎসাহ দিন। হিজিবিজি
যাই আঁকুক না কেন, প্রশংসা করুন। ‘দারুণ’, ‘খুব সুন্দর’ এসব শব্দে তাকে খুশি রাখুন।
ছবি আঁকা শিশুর মানসিক বিকাশে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার কল্পনার জগৎ বিস্তৃত
করতে সাহায্য করে। ঘরে কাটানো দীর্ঘ একটা সময়ের বেশ খানিকটা অংশ সে ছবি এঁকে কাটাতে পারে যেটা তার বৃদ্ধি
ও বিকাশের ক্ষেত্রে সাংঘাতিক জরুরি।
শিশুর উপযোগী বই রাখা এবং পড়ার অভ্যেস
গড়ে তোলা
ছবি
আঁকার সাথে সাথে শিশুর আরও একটি অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি, সেটি হলো বই পড়ার অভ্যেস। ছোটবেলা
থেকেই শিশুকে বইয়ের সাথে যুক্ত রাখার চেষ্টা করুন। দোকান বা লাইব্রেরিতে ছবিযুক্ত অনেক
বই পাওয়া যায়, শিশুকে সেগুলো কিনে দিন। সে পড়তে না পারুক, ছবি দেখে নিজের মত করে সে
গল্প ভেবে নিতে পারে। আপনি জিজ্ঞেস করলে দেখবেন ছবি দেখে দেখে নিজের মত করে সে গল্প
বলছে আপনাকে। শিশুদের এই অসাধারণ ক্ষমতাটা মুগ্ধ হবার মত। তার কল্পনার জগৎ কতোটা বিস্তৃত
আপনি তার গল্প শুনলেই বুঝতে পারবেন। বাবা কিংবা মা যখনই অবসর পাবেন, সন্তানকে তার প্রিয়
বই থেকে একটা গল্প পড়ে শোনান, আপনার এই অংশগ্রহণ তার আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। সম্ভব
হলে আপনার সন্তানকে নিয়ে বইয়ের দোকান বা লাইব্রেরিতে যান, তাকে বই পছন্দ করার সুযোগ
করে দিন। মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অসাধারণ। তার দীর্ঘ অবসরের কিছুটা সময়
বই নিয়ে কাটতে পারে অনায়াসেই।
গৃহে গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন
গাছ
শিশুর মানসিক প্রশান্তির অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। ধরুন আপনার সন্তানকে নিয়ে আপনি কিছু
গাছ লাগালেন। প্রতিদিন তাকে সাথে নিয়ে গাছগুলোর যত্ন করা, গাছে পানি দেয়া শিশুর জন্য
একটি নির্মল বিনোদন হতে পারে। আপনার বাড়ির সামনে বাগান বা গাছ লাগানোর সুযোগ থাকলে
আপনি সৌভাগ্যবান। কিন্তু শহর কেন্দ্রিক বাসা বা ফ্ল্যাটগুলোতে সাধারণত এই সুযোগ থাকে
না। সেক্ষেত্রে আপনি বেছে নিতে পারেন বাড়ির ব্যালকনি বা ছাদ। আপনার সন্তানকে নিয়ে গাছ
লাগান, প্রতিদিন গাছের পরিচর্যা করুন তাকে সাথে নিয়ে। শিশু তার অবসর সময়ে গাছের সান্নিধ্যে
কাটতে পারে দারুণ কিছু সময়। তাকে বুঝিয়ে বলুন গাছ ঠিক তার মতো করেই একটু একটু করে বড়
হয়, ফুল দেয় ,ফল দেয়। আমরা কীভাবে বেঁচে থাকার জন্য গাছ থেকে অক্সিজেন পাই এসব তথ্যসহ
গাছের নানা উপকারিতা বুঝিয়ে বলুন, এতে শিশুর মধ্যে অন্যমাত্রার জীবন ভাবনা তৈরি হবে।
তার স্বভাবে আচরণে যুক্ত হবে প্রকৃতি প্রেম, নমনীয়তা, সৌন্দর্যবোধ। আপনার অনুপস্থিতির
সময়গুলোতে তার গাছের সাথে তৈরি হতে পারে দারুণ বন্ধুত্ব।
শিশুর খেলার উপকরণ নির্বাচনে খেয়াল রাখা
প্রত্যেক
বাবা মা তার সন্তানের জন্য খেলার উপকরণ বা খেলনা কিনে থাকেন। তবে শিশুর জন্য খেলনা
নির্বাচন বা কেনার ক্ষেত্রে বাবা মায়ের কিছু বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। যেহেতু খেলনার
প্রতি যে কোনো বাচ্চার প্রচণ্ড আকর্ষণ থাকে তাই খেলনার মাধ্যমে বাচ্চাকে শেখানোর প্রক্রিয়াটি
খুবই কার্যকর হয়। তাই বাবা মা হিসেবে আপনি যখন সন্তানের জন্য খেলনা কিনবেন, অবশ্যই
মাথায় রাখবেন যেন সাধারণ খেলনার পাশাপাশি এমন কিছু খেলনাও থাকে যার মধ্যে কোনো না কোনো
শেখার বিষয় নিহিত থাকে। বাজারে এমন অনেক খেলনা আছে যেগুলো দিয়ে শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার
বিষয়গুলো দারুণভাবে নিশ্চিত করা যায়। শিশুরা খুব আনন্দ নিয়ে সেসব খেলনা দিয়ে খেলতে
খেলতে গুনতে শেখে, রঙ চিনতে শেখে, জীবজন্তু চিনতে শেখে, বর্ণের সাথে পরিচিত হয়। এসব
খেলনার সাথে তার কেটে যেতে পারে বেশ ভালো কিছু সময়। এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য,
খুব বেশি দামী খেলনা না কিনে দিয়ে শিশুর খেলনায় প্রকারভেদ রাখুন। কারণ যত দামী খেলনাই
হোক, আপনার সন্তান কিন্তু কিছুদিন পরে নির্দিষ্ট খেলনায় আগ্রহ হারাবে, নতুন কিছু চাইবে।
এটা শিশুদের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই খুব ভাল হয় একসাথে অনেক খেলনা না কিনে দিয়ে প্রতি
মাসেই সাধ্যের নাগালে রেখে একটা নতুন খেলনা নিয়ে আসুন আপনার সন্তানের জন্য। দেখবেন
– পছন্দমতো সময়ে সে খেলনা নিয়ে পার করছে অবসর।
শিক্ষামূলক কার্টুন বা ভিডিও দেখার ব্যবস্থা
রাখা
দিনের
একটা নির্ধারিত সময়ে শিশুকে বিভিন্ন শিক্ষামুলক কার্টুন বা অনুষ্ঠান দেখতে দেয়া যেতে
পারে, তবে সেটা মোবাইল ফোন বা ট্যাবে না দেখতে দেয়াই বাঞ্চনীয়। টিভি সেটে বা ডেক্সটপে
শিশুর জন্য কিছু ভিডিও ডাউনলোড করে রাখতে পারেন। যেমন— মীনা, সিসিমপুর, শিক্ষামূলক
শিশুতোষ ড্রামা। এসব ভিডিও দেখে আনন্দ পাওয়ার পাশাপাশি সে অনেক কিছু শিখতেও পারবে।
শুনে এবং দেখে শেখার প্রবণতা শিশুদের প্রবল। তাই ডাউনলোড করে রাখতে পারেন কিছু এনিমেটেড
ছড়া। যেগুলো শুনে শুনে সে মুখস্ত করে ফেলতে পারবে। এনিমেটেড গান এর সাথে শিশুরা বেশিরভাগ
নাচ করে, এটাও ভালো কারণ এতে তার প্রপার বডি মুভমেন্ট হয়। তবে ঘরে যারা সদস্য হিসেবে
বাবা মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুর সাথে থাকেন, একটা বিষয়ে তাদেরকে অবশ্যই সতর্ক করতে হবে।
শিশুর এই স্ক্রিনটাইম যেন দীর্ঘ সময় না হয়।
শিশুর ঘুমানোর জায়গাটা আরামদায়ক রাখা
পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই শিশুর ঘুমের সময় এবং স্থানটি সঠিক হওয়া জরুরি। শিশু যে কক্ষে ঘুমায় সেখানে আলো বাতাস পর্যাপ্ত কিনা, বিছানাটি আরামদায়ক কিনা, ঐ কক্ষটি শিশুর পছন্দ কিনা এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মশা। মশার উপদ্রব হলে প্রয়োজনবোধে দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করুন। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে শিশুর ঘুমের সময়টা প্রশান্তির এবং দীর্ঘ সময়ের হবে। এটি তার বিশ্রাম অংশের জন্য বিশেষ দরকারি।
আপনার
গৃহে উপরের আলোচিত বিষয়গুলোর ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে হলে আপনার সন্তান গৃহে আনন্দে থাকবে।
বাবা মায়ের দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি তার ওপর তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। পাশাপাশি
আপনার সন্তান একটি সুশৃঙ্খল এবং গঠনমূলক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হবে যেটা তার সঠিকভাবে
বেড়ে ওঠার জন্য অপরিহার্য।
শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা শ্রাবণ ১৪৩২ সংখ্যায় প্রকাশিত
স্বত্ব - শব্দমুকুর



Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.