গিটারসাধক নিলয় দাশ : ছয় তারের এক বিস্ময়! - হক ফারুক
শব্দ মুকুর নির্বাচিত কলাম
গিটারসাধক নিলয় দাশ : ছয় তারের এক বিস্ময়!
হক ফারুক
মাথায় একটা কালো টুপি। বড় বড় সিল্কি চুলগুলো সেটা পরেও লুকানো যাচ্ছে না। হাতে তার অ্যাকুস্টিক গিটার। দেখে বড়পর্দার নায়ক মনে হলেও মানুষটা কিন্ত আসলে গানের। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে থাকে তার। মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নেয়ার এক অসীম ক্ষমতা আছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় তার গিটারের অপূর্ব সুর-মূর্ছনা। গিটারকে ভালোবেসে ছয় তারে বিস্ময় জাগানিয়া এই কিংবদন্তির নাম নিলয় দাশ। যিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে গেলেও তার অবদান ও সৃষ্টি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
বাংলাদেশের সংগীত তথা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক গুরুস্থানীয় গিটারিস্ট ছিলেন নিলয় দাশ। আশির দশকেই তিনি ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল, নিও ক্ল্যাসিক্যাল, কান্ট্রি, ফ্ল্যামেনকো, ব্লুজ, রক মিউজিকে গিটারের অনবদ্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন গিটারিস্টদের আইকন। অন্যভাবে বললে গিটারদেরও গিটারিস্ট। বাংলাদেশের গিটার মিউজিকের শীর্ষস্থানীয় অনেক তারকাদেরও গিটারে তালিম, নতুন কিছু শেখা তার কাছে। অনেকটা উদাসী এই গিটারিস্ট তার সংগীত ক্যারিয়ারে বিশাল ভান্ডার উপহার দিয়ে যেতে না পারলেও গিটারের ছয়টি তারে যতটুটু সৃষ্টি রেখে গেছেন, সুমিষ্ট গলায় যে গান গেয়েছেন তা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনুপ্রেরণা জাগিয়ে যায়।
গিটারের বিস্ময় নিলয় দাশের জন্ম ১৯৬১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকাতে। পুরো নাম নিলয় কুমার দাশ। বড় হওয়ার পর যিনি হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় ‘নিলয় দা’। অনেকের কাছে ‘নিলয় ভাই’। তার বাবা উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী, নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপিকার সুধীন দাশ, মা সংগীত শিল্পী নীলিমা দাশ। বাংলা গান, রবীন্দ্র-সংগীত, নজরুল সংগীতে তারা দুইজনই গুণী শিল্পী। তাদের বড় সন্তান নিলয় দাশ সংগীত শিল্পী হবেন এমনটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে বাবা মায়ের মতো রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুল সংগীতের শিল্পী হবেন এমনটাই হওয়ার কথা ছিলো। যদিও পরবর্তী সময়ে গিটার হিরো নিলয় দাশের শুরুটা আসলে সেভাবেই হয়েছিলো। বাবা সুধীন দাশ যখন তার ছাত্র-ছাত্রীদের রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন তখন সেটা দেখে দেখে কিশোর নিলয়ও গাইতেন। ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় নিলয় দাশ ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনি’, ‘কতবারও দেখেছিনু আপনা ভুলিয়া’সহ আরও কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীত অসাধারণ গাইতে পারতেন। উদয়ন স্কুলের ছাত্র ছিলেন বলে প্রথম দিকে তাদের বাসাটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকাতেই ছিলো। তার ছোট বোন মিতা সুবর্ণার জন্মের পর তাদের পরিবার চলে আসে কলাবাগানে। সেখানেই নিলয় দাশের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কেটেছে।
কিশোর নিলয় তখনও স্কুলে। এর মধ্যেই তার গিটারের প্রতি আকর্ষণ জন্মাতে থাকে। পাড়ায় আশেপাশে যাকেই গিটার বাজাতে দেখে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তাকে বাসায় ডেকে আনে। অনেক সময় সেই বন্ধুটার কাছ থেকে চেয়ে ওর গিটারটা বাসায় নিয়ে আসে। বাজানোর চেষ্টা করে। ক্লাস টেনে যখন উঠলো তখন থেকে মান্না দে’র গান গাওয়া শুরু করে নিলয়। কিন্তু গিটারের প্রতি আকর্ষণটা যেন দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। একদিন এক বন্ধুর বাবা সুধীন দাশকে এসে বললেন, ‘আপনার ছেলে প্রতিদিন আমার ছেলের গিটার আপনাদের বাসায় নিয়ে আসে।’ এই কথা শুনে সুধীন দাশ আর দেরি করলেন না। কিশোর নিলয়কে একটা গিটার কিনে দিলেন। যাতে ছেলের বন্ধুর বাবার এমন অভিযোগ আর শুনতে না হয়।
নিলয় দাশের বন্ধু হ্যাপী আখন্দ তাকে গিটারে আরও অনুপ্রাণিত করেন। ১৯৮১ সালের দিকে নিজের চেষ্টাতেই শুরু হলো নিলয় দাশের গিটার শেখা। তার কিছুদিন পর তিনি মিস্টার লি ইয়াং নামে একজন কোরিয়ানের প্রেরণা ও সহযোগিতায় গিটারে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। এই কোরিয়ান ভদ্রলোকই ছিলেন গিটারে নিলয় দাশের একমাত্র শিক্ষক। অল্প কিছুদিন তার কাছ থেকে গিটারে তালিম নেন। এরপর তার গিটারের জার্নিটা পুরোপুরি নিজে নিজে। এই পর্যায়ে এসে শুরু হলো বিভিন্ন রেকর্ড শুনে গিটারে তোলা। সেখানে মোজার্ট, বাখ, বেটোফেন থেকে শুরু করে পিঙ্ক ফ্লয়েড, ডিপ পার্পল, ঈগলস, অল স্টুয়ার্ট, আমেরিকা, ব্রেড, নিল ইয়াং, ক্রসবি স্টিলস ন্যাশ, লোবো, বার্কলি জেমস হারভেস্ট, ড্যান ফকলারবার্গ, এয়ার সাপ্লাই, জিম করবি, সান্টানা কিছুই বাদ যেত না। র্যাচি ব্ল্যাকমোর, র্যান্ডি রোডস, ইয়াঙ্গই ম্যামস্টিন ও ভিনি মোরের গিটার বাজানোর অসম্ভব ভক্ত ছিলেন নিলয় দাশ।
ঢাকার মিউজিক সিনে
ততদিনে নিলয় দাশ এক অনন্য গিটারিস্ট। গিটারের আরেক দুই লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস
ছিলেন তার বন্ধু। নিলয় দাশের বাসায় একসময় তাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। নিলয় দাশের গিটার
ও গানকে ঘিরে ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের দিকে বাংলার বিগ ফোর খ্যাত ব্যান্ড রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেজ, ইন ঢাকা ও এইসেসের
বন্ধুদের এক বিরাট দলের প্রতিদিনের আড্ডা বসতো সংসদ ভবনে। সেখানে নিলয় দাশ গিটার বাজানো
ও গান গাওয়ার পাশাপাশি এইসব মিউজিশিয়ানদের গিটার বাজানোর নানা কৌশল রপ্ত করা ও ভোকাল
হারমোনি শেখাতেন। বলতে গেলে প্রথম জীবনে বিগ ফোরের গিটারিস্ট ও মিউজিশিয়ানদের অন্যতম
অনুপ্রেরণা ও অনেকের গিটারগুরু ছিলেন নিলয় দাশ। সংসদ ভবনে সেইসব আড্ডাতে থাকতেন ওয়ারফেজের
কমল, টিপু, বাবনা; রকস্ট্রাটার ইমরান, মঈনুল, আরশাদ, মাহবুব, শোয়েব; ইন ঢাকার মাশুক,
তুষার, জয়, রোজেন, গোর্কি, এবং এইসেসের ফুয়াদ, সাঈদ, রবি, সোমিসহ অনেকে। নিলয় দাশের
কাছে গিটার তালিম নিয়েছিলেন বেজবাবা সুমন, বাপ্পা মজুমদারের মতো গিটারিস্টরাও।
নিলয় দাশের প্রথম একক অডিও অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। সারগাম থেকে প্রকাশ হওয়া এই অ্যালবামের সংগীত পরিচালক ছিলেন ফোয়াদ নাসের বাবু। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে ভরা এই অ্যালবামে নিলয় দাশের গাওয়া অসাধারণ কিছু গান রয়েছে। ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’, ‘যখন নিবিড়’, ‘হ্যাপি’, ‘সাগর ডেকে বলে’ অ্যালবামের জনপ্রিয় হওয়া কয়েকটি গান। এই অ্যালবামে ‘বিবর্তন’ নামে নিলয় দাশের কম্পোজিশনে চমৎকার একটি গিটার ইন্সট্রুমেন্টাল আছে। তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘বিবাগী রাত’ প্রকাশ হয় সারগামের ব্যানারে ১৯৯২ সালে। আশিকুজ্জামান টুলু’র সঙ্গীত পরিচালনায় এই অ্যালবামটিও সেই সময়ে বেশ আলোচিত হয়। ‘আমার স্বপ্নের দরজা’, ‘বিবাগী রাত’, ‘স্বপ্নের সাওতালি’, ‘সন্ধ্যাতারা’ গানগুলো শ্রোতাপ্রিয় হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি অনেক মিক্সড অ্যালবামে কাজ করেছেন। এগুলোর মধ্যে টুগেদার, স্টারস, দেখা হবে বন্ধু, তুমিহীনা সারাবেলা, শুধু তোমার জন্য, কেউ সুখি নয় এবং সংকলন অ্যালবামের মধ্যে কাছে আসার দিন ভালোবাসার দিন অন্যতম।
নিলয় দাশ ছিলেন একাধারে
গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গিটার শিক্ষক। বিএ পাশ করার পরে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা
একাডেমিতে চাকরি নেন পারফর্মিং আর্টে গিটার শিক্ষক হিসেবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির
তৎকালীন মহাপরিচালক ছিলেন বরেণ্য সুরকার আজাদ রহমান। নিলয় দাশের উদ্যোগ ও তত্ত্ববধানেই
সেই সময় শিল্পকলাতে ইন্সট্রুমেন্টাল কনসার্টের আয়োজন করা হয়। তখন শিল্পকলাতে অনেক বিদেশি
শিল্পীরাও আসতেন। তারা নিলয় দাশের গিটার বাজানো দেখে অভিভূত হতেন। তারা নিলয় দাশকে
বিদেশে নিয়ে যেতে চাইতেন। নিলয় দাশের প্রয়াত বাবা ২০০৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,
‘‘নিলয়ের গানগুলো ছিলো খুব সোবার। বাণিজ্যিক কোনো চিন্তা নিয়ে গান করতো না। কিন্তু
আত্মপ্রচার বিমুখ ছিলো। ওর ধ্যান-জ্ঞান ছিলো গিটার। গিটার নিয়ে আমার ধারণা খুব বেশি
না হলেও বলব এ রকম হাত বিরল। একবার শিল্পকলায় আমেরিকার একটি টিম এসেছিলো। নিলয়ও তখন
শিল্পকলায় কন্ট্রাক্টে চাকরি করে। একদিন দেখি সেই বিদেশি গানের দল ও অন্যরা গোল হয়ে
সবাই দাঁড়িয়ে। সামনে গিয়ে দেখি নিলয় গিটার বাজাচ্ছে আর বোকার মতো হা হয়ে সবাই সেটা
দেখছে। আমেরিকানরা খুব জোর করতে লাগলো ওকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওই ব্যাটা
দেশ ছাড়বে না! মেহেদী হাসানের সঙ্গে সে গিটার বাজিয়েছে। ও যে কত বড় গিটারিস্ট তা টের
পেলাম আমি আরেকদিন। কলাবাগানে তখন আমাদের বাসা। সকাল থেকেই শুনি একটা গিটার পিস বেজেই
যাচ্ছে। ঝড়ের মতো স্পিড সে গিটারের। আমি বিরক্ত হয়ে ওকে বকা দিতে গেলাম। ভেবেছিলাম
বুঝি ওটা রেকর্ড বাজছে। আসলে ওই ঝড়ো গতিতে পিসটা বাজাচ্ছিলো নিলয়। সেদিন বুঝলাম কতবড়
ট্যালেন্ট আমার ছেলে। কিন্তু কিছুই সইলো না। আমার আগেই ও পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো!”
নিলয় দাশ ভারতীয়
উপমহাদেশের বিশিষ্ট সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব গোলাম আলীর সঙ্গেও গিটার বাজিয়েছিলেন।
নিলয় দাশ ১৯৯৩ সালের
দিকে ব্যান্ডদল ‘ট্রিলজি’ গঠন করেন। ট্রিলজি সেই সময়ে উল্লেখযোগ্য সব শোতে অংশ নেয়।
একটা সময়ে মিউজিকে সরব থাকলেও কিছুটা নিরুৎসাহিত হয়ে অ্যালবাম প্রকাশ থেকে অনেক দূরে
সরে আসেন নিলয় দাশ। পরবর্তীতে ‘দ্য জেনমস’ নামে ব্যান্ড গঠন করেন। ক্যারিয়ারের শুরু
থেকেই তিনি বিভিন্ন বড় বড় হোটেলে শো করতেন।
নিলয় দাস তার প্রিয় বন্ধুকে স্মরণীয় করে রাখতে ‘হ্যাপি স্কুল অফ মিউজিক’ নামে একটি মিউজিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে গিটার শিখেছেন অনেকেই। দীর্ঘ বিরতির পর নিলয় দাশ একটি অ্যালবামের কাজ শুরু করেছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি চট্টগ্রামে এক শোতে যান। কিন্তু ১১ জানুয়ারি সেখানে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। চট্টগ্রামের সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালে এদিন রাত ৯টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই গিটার-সাধক মৃত্যুবরণ করেন।
নিলয় দাশের যত গান
● একক অ্যালবাম
কত যে খুঁজেছি তোমায় (১৯৮৯)
কত যে খুঁজেছি তোমায়
পথ চলছি
সাগর যেতে বলে
সময়ের সূচনা
সেই অচেনা
একা থাকা
হ্যাপি
দুচোখে তোমার
আমি মুক্তি পেয়েছি
যখন দেখি
বিবর্তন (ইন্সট্রুমেন্টাল)
যখন নিবিড়
বিবাগী রাত (১৯৯২)
আমার স্বপ্নের দরজা
বিবাগী রাত
ছেড়ে গেল চাঁদ
ভালোবাসি জোৎস্না
আকাশ কত বিশাল
সেই ভালো
স্বপ্নের সাওতালী
সাকি
সন্ধ্যাতারা
আরশী ও আমি
রাস্তার ছেলে
অপবাদ
●
মিক্সড অ্যালবাম
টুগেদার
লাশ কাটা ঘরে
ফিরে দেখো আমাকে
স্টার’স
অবহেলা
দেখা হবে বন্ধু
এইটুক খোলা রেখ পথ
তুমিহীনা সারাবেলা
এ শহর ডুবে যায়
শুধু তোমার জন্য
মনে পড়ে গেল (ফাহমিদা
নবীর সঙ্গে)
কেউ সুখী নয়
বৃষ্টি
● সংকলন অ্যালবাম
কাছে আসার দিন ভালোবাসার
দিন
তোমাকেই প্রয়োজন
ও তুমি মেয়ে
*সারগাম থেকে প্রকাশিত
‘বেস্ট অব নিলয় : বিবাগী রাত’ ও ‘সন্ধ্যাতারা’ মূলত নিলয় দাশের প্রথম ও দ্বিতীয় অ্যালবামের
নতুন করে প্রকাশ।
শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা শ্রাবণ ১৪৩২ সংখ্যায় প্রকাশিত
স্বত্ব - শব্দমুকুর





Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.