শব্দ মুকুর বায়োস্কোপ - ফারহান আবিদ - রঙিলা কিতাব
শব্দ মুকুর বায়োস্কোপ
নিয়তি আর মানুষ, মুখোমুখি: রঙিলা কিতাব
কলমে - ফারহান আবিদ
নিয়তি। মানুষের জীবনের সমীকরণটা অনেকটা এমন। যা সাধারণ হিসাবে হবার কথা, সেটা সব সময় ঘটে না। আবার বহু সময় যা হবার কথা, সেটা কিংবা তার চাইতেও বেশি প্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে থাকে। এই দুই রকম ঘটনা এবং না-ঘটনার মাঝের ফাঁকা জায়গাটাকেই আমার মনে হয় মানুষের নিয়তি। নিয়তিকে সংজ্ঞায়িত করার যেই চেষ্টাটা করলাম, তার একটা প্রকৃত প্রজেকশন বলতে পারেন অনম বিশ্বাস পরিচালিত ক্রাইম-থ্রিলার ওয়েব সিরিজ রঙিলা কিতাব। ওয়েব ধারাবাহিকটি কিঙ্কর আহসান এর একটি উপন্যাস থেকে অনম বিশ্বাস এবং আশরাফুল আলম শাওন এর তৈরি চিত্রনাট্য থেকে নির্মিত হয়েছে। রঙিলা কিতাবকে বলতে পারেন নিয়তি, বাস্তবতা, সংগ্রাম এর গল্প।
ক্রাইম থ্রিলার আমাদের দেশে খুব বেশি হয়নি এখন পর্যন্ত। বিশেষ করে ওয়েব সিরিজ আমরা ক্রাইম থ্রিলার জনরাতে সাফল্যের সাথে হতে সেই অর্থে দেখিনি। থ্রিলার আমরা দেখেছি, যদিও সেটাও সংখ্যা ও মানের বিচারে নিঃসন্দেহ না। ক্রাইম ইনফিউজড জনরার ধারণাটা আমাদের ফিকশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রায় নতুনই বলা যায়। তবে এই জনরায় কাজ হচ্ছে আজকাল।
রঙিলা কিতাব এর মধ্যে আমি একরকম
নিষ্ঠাপূর্ণ চেষ্টা দেখতে পেয়েছি। দর্শনধারী হিসাবের বাইরে উঠে গুণ বিচার হিসাবে যাওয়ার
সম্পূর্ণ চেষ্টা ওয়েব সিরিজটিতে দেখা গেছে। স্টোরি টেলিংই শুধু না, স্টোরি টেলিং এর
অ্যাপ্রোচ, গল্পের সাথে সাথে সব রকম লজিক্যাল-রেশনাল প্রগ্রেশন এর যেই যুথবদ্ধতা কোন
ফিকশন তৈরিতে প্রাথমিকতম অবদান রাখে, সেই জায়গাতে রঙিলা কিতাব একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করেছে।
গল্পের মেক বিলিভ সফল আমি বলবো। একটা বড় ঝুঁকির জায়গা ছিলো একই জনরাতে প্রচুর ভারতীয়
কাজ যেহেতু বিগত কয়েক দশকে হয়ে গেছে, সেগুলোর প্রভাব কাটিয়ে উঠে কিছু বানানো।
আমার হিসাবে, এই কাজটা অনম বিশ্বাস বেশ সফলতার সাথে করেছেন। আমরা জানি যে, কোন স্ক্রিপ্টে একরকম গ্রাফ থাকতে হয়। যেটা গল্পকে গল্পের উঠানে এনে (সেটআপ) তারপর প্লটপয়েন্ট অথবা রাইজিং অ্যাকশন এনট্যুর করে কনফ্রনটেশন এ পৌঁছায়। এরপর ক্লাইম্যাক্স এনট্যুর করে রেজোল্যুশনে যায়। আইডিয়ালি শেষে গিয়ে কোনো কোনো গল্প ক্লিফহ্যাঙ্গার দেয়, পরবর্তী কিস্তি, মানে সিক্যোয়েল/সিরিজ কাজ হলে। আমার বিচারে মানি হাইস্ট এমন একটা সিরিজ যার গোটা সিজনে তো বটেই, প্রতিটি এপিসোডে আমরা এই গ্রাফটা দেখতে পাই।
খুব অত্যুক্তি যদি আপনারা মনেও করেন, তবুও আমি বলবো রঙিলা কিতাব-এ প্রতিটা এপিসোডে এই গ্রাফটা আমি পেয়েছি। স্টোরি টেলিং, নির্মাণের জায়গা থেকে কিছু বিষয় আমার কাছে অনেকটাই ওরিজিনাল মনে হয়েছে। ঠিক ওরিজিনাল যদি নাও হয়ে থাকে, অন্তত আমাদের দেশি ফিকশনের জন্য অনেকখানিই নতুন ট্রিট মনে হয়েছে। ফিকশনের মাঝে নীরবতা, আকস্মিক শব্দ, অন্ধকার বা অন্ধকার রাস্তা, কোনো চরিত্রের ক্লোজআপ শট, দূরের পুলিশ সাইরেন, শ্বাসরুদ্ধকর চেজিং এই সমস্ত বিষয় দারুণ থ্রিল তৈরি করেছে, যেই ট্রিটমেন্ট আমাদের ফিকশনে খুব বেশি একটা দেখা যায়নি। এই ফিকশনে এই ট্রিটমেন্টগুলো সফলভাবে ব্যবহার হয়েছে।
ক্রাইম-থ্রিলার মানে যে শুধু অ্যাকশন না, তার চাইতেও বেশি টেনশন, এবং টেনশন তৈরি করাতেও যে শৈল্পিকতা থাকতে পারে, সেই প্রজেকশন আমরা রঙিলা কিতাব-এ দেখতে পাই। প্রদীপ আর সুপ্তিকে সেন্টারে রেখে যেই গল্পটা তৈরি করলেন অনম বিশ্বাস আর আশরাফুল আলম শাওন, তার ভিত্তিটা সলিড। আর গল্পের ভিত্তি সলিড বলেই এখানে নওরোজ শাহ কিংবা জাহাঙ্গীর অথবা আজম চৌধুরী, হেলেনা এদের সবাইকে সময়ের সুচারু ছাঁচে যথাযথ ইমেজ সহ স্থাপন করতে পেরেছেন। এদের চাইতেও তুলনামূলক কম স্ক্রিনটাইমের চরিত্রদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিপ্টে একোমোডেট করাটা যথাযথ হয়েছে বলে মনে করি। নওরোজ শাহের ছেলে শাহেদ এর চরিত্রটিই ধরুন।
সংলাপে সময়ের সাথে থাকার স্বাদ পাওয়া গেছে। একই সাথে একরকম নিজস্ব এপেটাইট তৈরির চেষ্টা দেখা গেছে। স্ক্রিপ্টটা ভারতীয় গ্যাংস্টার মুভি, ওয়েব সিরিজ এসবের প্রভাব মুক্ত ছিলো। আমার মনে হয়েছে। রঙিলা কিতাব এর গল্পে সূক্ষ্ম, তবু কিছু বিষয় ছিলো যেগুলোর ডিটেইলিং, প্রিসিশন ভীষণ জরুরি ছিলো। প্রথমত, এটা ঢাকা শহরকে ভিত্তি করে তৈরি গল্প না। দ্বিতীয়ত, চরিত্রগুলোর অধিকাংশই সাধারণ, নৈমিত্তিক মানুষদের মতো না। এরা সবাই ক্ষমতার আশেপাশের, ক্ষমতার উপ চরিত্র। সে কারণে শিল্প নির্দেশক মিখাইল নাজমুল এর কাজটুকু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই ওয়েব সিরিজটিকে সঠিক ইমেজারি তৈরি করতে প্রত্যক্ষ মদদ আরও যারা দিয়েছেন তাদের মধ্যে মিখাইল অন্যতম প্রধান।
ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের এই যে সম্পূর্ণ ভিন্ন কনটেক্সট, সাবটেক্সট, এসবের উপর দাঁড়িয়ে যেই গল্পটা বলা হয়, সেই গল্পের যথাযথ প্রজেকশন এর একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অংশ কস্টিউম। কস্টিউম ডিজাইনিঙ, প্ল্যানিং এবং এগজিকিউশনে প্রীতি রোজারিও নিষ্ঠার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার কাজের ডিটেইলিং ছিলো। কস্টিউমে যখন ডিটেইল পর্যায়ে কাজ হয়, তখন সেটার এগজিকিউশন আরও কঠিন হয়ে যায়। যেহেতু এগজিকিউশন পার্টটুকু তারা দারুণভাবে করেছেন, সেজন্য প্রীতিকে তার প্রাপ্যটুকু অবশ্যই দিতে হবে। বিজিএম, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বেশ পরিণত হয়েছে মনে হয়েছে।
সবচাইতে দারুণ বিষয় ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে তা হলো এবসেন্স অফ সাউন্ড এর ব্যবহার। মানে নীরবতার ব্যবহার। আমরা সাধারণত আমাদের দেশের থ্রিলার-সাসপেন্স কাজগুলোতে শব্দের লাউডনেস, যথেচ্ছ শব্দ শুনতে পাই। রঙিলা কিতাব এর বিজিএম-এ এই বিষয়টা রুসলান রেহমান বেশ ইনট্রিকেটভাবে ডিল করেছেন। মফস্বল শহরের যেই শব্দ, তার ডিটেইলিং নিয়ে রুসলান কাজ করেছেন। বেশ কিছু অ্যাকশন সিকোয়েন্স আছে ওয়েব সিরিজটিতে, সেগুলোর শব্দ আমার মনে হয়েছে আমাদের দেশে যেরকম কাজ এ-যাবৎ হয়েছে সেসবের তুলনায় বেশ ভালো। এছাড়া একটি গান আছে, টোনাটুনির ঘর। গানটি লিখেছেন অনম বিশ্বাস, সুর এবং কণ্ঠ দিয়েছেন ইমরান মাহমুদুল।
সিনেম্যাটোগ্রাফির কাজ
আমার পছন্দ হয়েছে। স্ক্রিপ্ট এবং পরিচালকের বয়ান হিসাবে সিনেম্যাটোগ্রাফি যথাযথ মনে
হয়েছে। তানভীর আহসানকে সিনেম্যাটোগ্রাফির কাজের জন্য ধন্যবাদ। এডিটিং ভাল হয়েছে, করেছেন
লিওন রোজারিও এবং আশিকুর রহমান সুজন। কালার গ্রেডিং ক্লোজ টু নেচার ছিলো মনে হয়েছে।
কালার গ্রেডিং করেছেন প্রসেনজিত ব্যানার্জি।
প্রদীপ চরিত্রে ইমরান নূর বেশ ভাল কাজ করেছেন, নিঃসন্দেহে। তারপরও আমার মনে হয়েছে তার নিজের কাজ ছাড়িয়ে যাওয়ার বিশাল সম্ভাবনা এই সিরিজটাতে ছিলো। তিনি সেই সম্ভাবনাটা কাজে লাগাতে পারেন নাই। আমার হিসাবে পরীমনির এটা বেস্ট কাজ। আমি তার মেইনস্ট্রিম সিনেমা দেখি নাই। এর বাইরের কাজগুলো দেখেছি, সেই বিচারে বললাম। তিনি নিঃসন্দেহে দারুণ অভিনেত্রী। সম্ভবত তিনি নিজে তার ট্যালেন্ট এর ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নন। আমার ধারণা তিনি ওয়াকিবহাল হলে, আমরা তার আরও অসংখ্য দারুণ কাজ দেখতে পেতাম। পরীমনির মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
সুপ্তি চরিত্রে পরীমনি নিজেকে ভীষণ দক্ষতার সাথে ভেঙেছেন। ফজলুর রহমান বাবু, মনোজ কুমার প্রামাণিক, ইরেশ যাকের, শিল্পী সরকার অপু, সমু চৌধুরী সবাই দুর্দান্ত টিমমেট এর মত কাজ করে ওয়েব সিরিজটিকে পূর্ণতা দিয়েছেন। যদিও তানভিন সুইটির কাজ ভীষণ মিসফিট মনে হয়েছে, আশপাশের অন্যান্য শিল্পীদের তুলনায়।
রঙিলা কিতাব টিপিক্যাল থ্রিলার-সাসপেন্স এর বাইরে নিজস্ব উচ্চারণের ক্রাইম-থ্রিলার ফিকশন, যেখানে আমাদের নিজস্ব ভিজ্যুয়াল, নিজস্ব শব্দ প্রজেক্টেড হয়েছে। এই সিরিজটাতে কিছু ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন তোলা হয়, যেগুলো আমরা টিপিক্যালি শুনতে পাই না। যেমন ধরুন, "অপরাধীর কি দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে?" অথবা "পরিবারের জন্য মানুষ কতদূর যেতে পারে?” আমরা চাই আমাদের ভিডিও ফিকশন, ওয়েব কনটেন্ট মার্কেটে এরকম আরও বহু রকম প্রশ্ন তোলা হোক। সেই সাথে আমরা গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে এগোই ধীরে, তবে শ্লথ না। সাধুবাদ অনম বিশ্বাস এবং টিমকে।
জয়তু বাংলা সিনেমা,
ডিজিটাল ফিকশন।
স্বত্ব - লেখক ও শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা

%20(1).png)
.jpg)

Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.