তানজীনা ফেরদৌসের আইন পরামর্শ - পাওনা টাকা আদায়ের আইনি পদ্ধতি
তানজীনা ফেরদৌসের আইন পরামর্শ
আইন
ও অধিকার
পাওনা টাকা আদায়ের আইনি পদ্ধতি
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক লেনদেনে অনেক সময় টাকা ধার দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনেকেই সময়মতো পাওনা টাকা ফেরত দেন না। এমন পরিস্থিতিতে পাওনাদারদের জন্য আইনের সহায়তা নেওয়া একটি কার্যকর পন্থা হতে পারে। তবে, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুসরণ করা উচিত যা ভবিষ্যতে পাওনা টাকা আদায়ে সহায়ক হবে।
চুক্তিপত্র: পাওনা টাকা আদায়ের মূল হাতিয়ার
টাকা ধার দেওয়ার
সময় মৌখিক প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে লিখিত চুক্তি করা অত্যন্ত জরুরি। চুক্তিপত্রের মাধ্যমে
লেনদেন স্বচ্ছ হয় এবং এটি আইনি স্বীকৃতি পায়।
চুক্তিপত্র তৈরির প্রক্রিয়া
● লিখিত চুক্তি সম্পাদন: ধার দেওয়ার সময়
৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি লিখিত চুক্তি সম্পাদন করুন।
● চুক্তির শর্তাবলী: চুক্তিতে কী কারণে টাকা
ধার দেওয়া হলো, পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা এবং কিস্তিতে বা একসঙ্গে পরিশোধের শর্তাবলী
উল্লেখ করতে হবে।
● সাক্ষী: চুক্তির সময় দুই বা ততোধিক সাক্ষী
রাখুন, যারা পরবর্তীতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারবেন।
● আইনি আশ্রয়ের সুযোগ: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে
টাকা ফেরত না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
● চুক্তির সত্যায়ন: প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট
বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে চুক্তিটি সত্যায়িত করা বাঞ্ছনীয়।
প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনে একই পদ্ধতি অনুসরণ
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান
বা কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন হয়, তাহলেও চুক্তিপত্র সম্পাদন করুন।
আপোষ মিমাংসার মাধ্যমে টাকা উদ্ধার
পাওনাদার দেনাদারের
মধ্যে আপোষ মিমাংসার মাধ্যমে টাকা উদ্ধার করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিগণের
মধ্যস্থতায় এই আপোষ মিমাংসা হতে পারে। আপোষ মিমাংসার মাধ্যমে পাওনা টাকা উদ্ধার সম্ভব
না হলে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে হবে।
আইনি প্রক্রিয়া
পাওনা টাকা আদায়ের জন্য মূল মামলায় যাওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রথমেই ভুক্তভোগীকে একজন দক্ষ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। আইনজীবীর মাধ্যমে দেনাদারের নিকট একটি লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করা হবে, যেখানে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকবে। লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করতে হবে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেনাদার টাকা পরিশোধ না করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নোটিশটি অবশ্যই রেজিস্ট্রার ডাকযোগে দেনাদারের ঠিকানায় পাঠাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কপি সংরক্ষণ করতে হবে।
দেনাদার যদি উক্ত সময়ের মধ্যে পাওনা টাকা পরিশোধ করে, তাহলে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে, দেনাদারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে নিকটস্থ আদালতে যেতে হবে এবং একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তায় পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
দেওয়ানি মামলা (Civil Case)
যদি পাওনাদার সময়মতো
টাকা ফেরত না দেন, তবে মানি স্যুট বা অর্থ মামলা করা যায়।
● কোর্ট ফি: দাবিকৃত টাকার ২.৫% হারে এডভেলোরেম
তৎসহ ১৫% ভ্যাট কোর্ট ফি প্রদান করে মামলা করতে পারেন। এক্ষেত্রে কোর্ট ফি সর্বদা অফেরতযোগ্য
বটে।
● ডিক্রি আদায়: আদালত পাওনাদারের পক্ষে
ডিক্রি দিলে, প্রয়োজনে দায়ীর সম্পত্তি ক্রোক করে টাকা আদায় করা হয়।
ফৌজদারি মামলা (Criminal Case)
প্রতারণা বা অপরাধমূলক
বিশ্বাসভঙ্গের জন্য ফৌজদারি আদালতে সিআর (CR) মামলা করা যায়।
●
এজাহার বা নালিশি মামলা: থানায় এজাহার
দায়ের বা সরাসরি আদালতে অভিযোগ করা যায়।
●
ধারা: দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) এবং
৪২০ (প্রতারণা) ধারায় মামলা করা যেতে পারে।
●
জামিন: অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ জামিন
নাও পেতে পারেন।
চেক ডিজঅনার মামলা
প্রতিপক্ষ চেক দিয়ে
থাকলে এবং তা ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ডিজঅনার হলে, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট,
১৮৮১ অনুযায়ী মামলা করা যায়।
●
৩০ দিনের মধ্যে নোটিশ: ডিজঅনার হওয়ার
৩০ দিনের মধ্যে প্রতিপক্ষকে নোটিশ পাঠাতে হবে।
●
অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে মামলা: নির্দিষ্ট
সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত না দিলে আদালতে মামলা করা যাবে।
প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাওনা টাকার মামলা
অর্থঋণ আদালত আইন,
২০০৩ অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পাওনা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে
পারে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
কোনো ব্যাংক বা আর্থিক
প্রতিষ্ঠান ঋণের টাকা আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে পারে। যদি বন্ধক
রাখা সম্পত্তি থেকে টাকা আদায় সম্ভব না হয়, তবে আদালতের মাধ্যমে ডিক্রি জারি করা হয়।
কর্মচারীর পাওনা
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মচারীরা যদি মজুরি বা অন্য পাওনা বেতন না পান, তবে শ্রম আদালত বা দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারে। কোনো মামলার ক্ষেত্রে যে কোনো স্তরে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে টাকার সমাধান করা যেতে পারে, যা উভয় পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো পাওনা টাকা আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিকার নিশ্চিত করেছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধার দেওয়ার সময় চুক্তিপত্র সম্পাদন এবং সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার মাধ্যমে নিজেকে আইনি সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।স্বত্ব - শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা
শব্দ মুকুর ই-পত্রিকা শ্রাবণ ১৪৩২ সংখ্যায় প্রকাশিত

Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.