পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণীকূলের রক্ষণাবেক্ষণে ধর্মীয় দর্শন - আমজাদ হোসাইন
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণীকূলের রক্ষণাবেক্ষণে ধর্মীয় দর্শন
আমজাদ হোসাইন
শব্দ মুকুর ই-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত আমজাদ হোসাইনের মানবতা কলাম, ধর্মীয় আলোকে জীবনধারা থেকে সংগৃহীত, এবং মনন মুকুর মিডিয়া ই-প্রকাশনায় ই-সংকলনের আঙ্গিকে প্রকাশিত। সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন ফারাহ জেহির।
পৌষ মাস মানুষকে ধীরস্থিরতা শেখায়; স্বল্পভাষী, মিতব্যয়ী, এবং দূরদর্শী হতে শেখায়। পৌষের ধানখেতে জমে থাকা শিশিরবিন্দু, নদীর স্বচ্ছ জল আর ধূসর আকাশের নীরবতার মাঝেই ধর্মীয় দর্শনের শুদ্ধ, গভীর পাঠ লুকিয়ে আছে। পবিত্রতা মানে যদি ইবাদতের নিয়ম মানা হয়, তবে পবিত্রতা মানে পৃথিবীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও।মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ধর্ম মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে, এই পৃথিবী কারও একক সম্পত্তি নয়। ইসলাম এই ধারণাকে স্পষ্ট করেছে খিলাফাহ তত্ত্বে। কুরআন বলে, “তিনি তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন” (সূরা আল-আনআম: ১৬৫)। প্রতিনিধি মানে ভোগদখলকারী এ কথা ভুল। প্রতিনিধি মানে রক্ষক। তাই পরিবেশ ধ্বংস, পানি দূষণ, প্রাণী নিধন এসব যে শুধু সামাজিক অপরাধ তা না, এসব অন্তরের বিশ্বাসভঙ্গও।
ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংশ। এ কথা আমরা বারবার বলি, কিন্তু এর ব্যাপ্তি বুঝি কম। অজু ও গোসলের পাশাপাশি রাস্তা পরিষ্কার রাখা, পানি অপবিত্র না করা, দুর্গন্ধ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা এসব নববী শিক্ষার অংশ। হাদিসে এসেছে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো সদকা। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা করলে কেয়ামতের দিন সে প্রাণী অভিযোগ করবে। এমনকি যুদ্ধের সময়ও গাছ কাটতে, পশু হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। যা বিস্ময়কর পরিবেশনীতি।
হিন্দু দর্শনে প্রকৃতি ঈশ্বরেরই আরেক রূপ। উপনিষদে বলা হয়েছে, “ঈশাবাস্যমিদং সর্বং” এই জগতে সবকিছুর ভেতরেই ঈশ্বর বিরাজমান। তাই নদী দূষণ মানে দেবীর অবমাননা, বন উজাড় মানে জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। প্রাচীন ভারতে বৃক্ষরোপণ ছিল ধর্মীয় কাজ, পুকুর খনন ছিল পুণ্য। এই দর্শন আজকের পরিবেশবাদী চিন্তার চেয়েও গভীর।
বৌদ্ধ দর্শন পরিবেশ সংরক্ষণকে দেখেছে করুণা ও সচেতনতার আলোকে। প্রতীত্যসমুত্পাদ তত্ত্ব বলে সবকিছু একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্রাণ ধ্বংস মানে এই শৃঙ্খলে আঘাত করা। তাই বুদ্ধমূর্তির মুখে যে প্রশান্তি, তা প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের প্রতীক। জৈন দর্শন তো আরও কঠোর। অহিংসা সেখানে জীবনযাপন পদ্ধতি।
আজকের বিশ্বে পরিবেশ সংকট আর তত্ত্ব নয় এটি হয়ে উঠেছে বাস্তবতা। নদী মরে যাচ্ছে, শহর দমবন্ধ করছে, পাখি হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে নদীদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, বন উজাড়, বন্যপ্রাণী নিধন সবই ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় দর্শনকে আমরা নৈতিক বক্তৃতা বলব না৷ আমরা এটিকে কার্যকর দিকনির্দেশনা বলব।
পৌষ আমাদের শেখায় সংযম। কম খাওয়া, কম অপচয়, মৌসুমি খাদ্য গ্রহণ, এসব ধর্মীয়ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন বলে, “খাও, পান করো, কিন্তু অপচয় করো না” (সূরা আরাফ: ৩১)। আধুনিক পরিবেশবাদ আজ যাকে বলে sustainable living, ধর্ম তা শিখিয়েছে শতাব্দী আগে।
প্রাণিকুলের রক্ষণাবেক্ষণও এই দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি কুকুরকে পানি দেওয়ার জন্য একজন পাপী নারী ক্ষমা পেয়েছিল। এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর নিকট দয়া কখনো ছোট নয়। আজ যখন শহরে কুকুর, বিড়াল, পাখি অনাহারে মরে, তখন আমাদের ধার্মিকতা কেবল মসজিদ-মন্দিরে আটকে থাকলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাংলার লোকধর্মেও এই বোধ প্রবল। লালন, হাছন, শাহ আবদুল করিম, সবাই বলেছেন, মানুষ মানে নামাজি বা পূজারি হওয়া নয়, মানুষ মানে মাটির দায় নেওয়া। নদী, বাতাস, প্রাণ, সব মিলিয়েই মানুষ।
পৌষ তাই শুধু শীতের মাস নয়। এটি আত্মসমালোচনার সময়। আমরা কতটা পরিষ্কার, কতটা দায়িত্বশীল, কতটা দয়ালু এই প্রশ্নগুলো ফিরে আসে শিশিরভেজা ভোরে। ধর্ম যদি মানুষকে পরিচ্ছন্ন না করে, প্রকৃতিপ্রেমী না করে, প্রাণবান্ধব না করে তবে সেই ধর্ম কেবল আনুষ্ঠানিকতা।
আর মানুষ যদি ধর্মের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করে তবে সে নিজের ভবিষ্যৎই ধ্বংস করছে। পৌষ নীরবে সেই সত্যটাই আমাদের সামনে মেলে ধরে।
শব্দ মুকুর ই-ম্যাগাজিন পৌষ, ১৪৩২
মনন মুকুর মিডিয়া ই-প্রকাশনায় প্রকাশিত, শুধুমাত্র শব্দমুকুর দ্বিভাষিক অনলাইন পাঠাগারের জন্য। সাব্সক্রিপশন নিয়ে পড়ার জন্য যোগাযোগ করুন - subscribers@mukuradam.org

.jpg)
.png)

Comments
Post a Comment
Thank you for your comment and interest in shobdomukur.com. One of our editorial team members will respond to your comment.